ড. রতন কুন্ডু
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী ডঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ ডাবল্ড হেপলয়েড পদ্ধতি নামে একটি আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বের প্রধান ফসল গমের নতুন জাত তৈরী করার সময় প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনেন। প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ডাবল্ড হেপলয়েড পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পদ্ধতিতে প্রথমে গমের সাথে ভুট্টার সংকরায়ণ করে একটি হাইব্রিড ভ্রুণ তৈরী করা হয়। সংকরায়নের কয়েক দিনের মধ্যে ভুট্টার ক্রোমজোম মারা গেলে ঐ ভ্রুণের মধ্যে গমের অর্ধেক ক্রোমজোম থাকে যাকে বলা হয় হেপলয়েড ভ্রুণ। টিস্যুকালচার পদ্ধতির মাধ্যমে এই হেপলয়েড ভ্রুণ থেকে চারা তৈরি করা হয়। এরপর একটি বিশেষ কেমিক্যাল প্রয়োগ করে ঐ চারার ক্রোমজোম আবার দ্বিগুণ করে স্বাভাবিক গমেরগাছ তৈরি করা হয়। এর ফলে ঐ গাছের বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট নিয়ন্ত্রনকারী জিনগুলো এক জেনারেশনেই স্হায়ী হয়ে যায়। প্রচলিত পদ্ধতির এই জিনগুলো স্হায়ী হতে কমপক্ষে ৬ জেনারেশন সময় লাগে। এরফলে গমের জাত উদ্ভাবনের সময় অনেক কমে যায়।
সম্প্রতি সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইটে ৯ই জানুয়ারী ২০২৫ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটির অনুবাদ সংযোজন করা হলো।
গম প্রজনন, ডাবল্ড হেপলয়েড টেকনোলজিতে রুপান্তর
ভবিষৎ খাদ্যের জন্য প্রজনন প্রজনন বিজ্ঞানের অগ্রগতি খাদ্য শস্য উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এবং ক্রমবর্ধমান বিশ্ব জনসংখার খাদ্য চাহিদার চালেন্জ্ঞ মোকাবেলায় সাহায্য করেছে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ প্রজনন প্রতিষ্ঠানে (পি বি আই) কর্মরত ডঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ ডাবল্ড হেপলয়েড (ডি এইচ) গম প্রজনন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করে এক যুগান্তকারী অবদান রাখেন। এই উদ্ভাবন পদ্ধতি গমের নতুন জাত তৈরী করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ১০-১২ বছর থেকে ৬ বছরে কমিয়ে আনে, যা প্রজনন কর্মসূচির জন্য একটি দ্রুত এবং দক্ষ দিক নির্দেশনা প্রদান করে।
গম প্রজননের অগ্রণী সাফল্য নতুন পদ্ধতিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ডঃ আহমেদ এবং পি বি আই টীম অষ্ট্রেলিয়া ব্যাপী অনেকগুলো প্রজনন কর্মসূচিতে পরিসেবা প্রদান করে।
২০০৪ সাল থেকে লংরিচ প্ল্যান্ট ব্রিডার্স (সিনজেনটা ও প্যাসিফিক সিডস্) এর মত বহুজাতিক কোম্পানি ডি এইচ প্রযুক্তি গ্রহণ করে, যার ফলে ২০১০ সালে অষ্ট্রেলিয়াতে প্রথম ডি এইচ গমের জাত “স্পিটফায়ার” অবমুক্ত হয়।
২০২৪ সালের মধ্যে ডিএইচ টীম সফল ভাবে বানিজ্যিক কোম্পানিগুলিতে হাজার হাজার ডিএইচ গাছ সরবরাহ করে, যার ফলে অষ্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু এলাকার জন্য ২৫টি জাত অবমুক্ত হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান ডিএইচ প্রযুক্তির এই সাফল্য উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে। ডঃ আহমেদকে এই পদ্ধতিটি উপস্থাপন এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রন জানায় এবং ইতোপূর্বে তিনি বহু দেশে এতদসংক্রান্ত কর্মশালায় নিজস্ব উদ্ভাবন তুলে ধরেন ।
একাডেমিক প্রভাব ডঃ আহমেদের এই টেকনোলজী স্প্রীনজার ন্যাচার কতৃক প্রকাশিত একটি বিজ্ঞান বইতে চ্যাপ্টার হিসেবে প্রকাশিত হয়।
উল্লেখ্য, ডঃ আহমেদ ১৯৫৫ সালে মতলব উপজেলার, সুগন্ধী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। উনি ১৯৭২ সালে কুমিল্লা বোর্ডের এস এস সি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্হান অধিকার করেন। এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এস সি (এজি) পরিক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডীগ্রী লাভ করেন।
ডঃ আহমেদের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে নওশাদ আহমেদ গ্রেট সাউদার্ন ব্যাংকের চীফ অপারেটিং অফিসার এবং মেয়ে সানজানা আহমেদ কমনওয়েল্থ ব্যাংকের এক্সিকিউভ ম্যানেজার।

