বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ | Thursday, October 15, 2026
Homeঅস্ট্রেলিয়াঅস্ট্রেলিয়ায় ভিসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন, শিক্ষার্থী-ভিজিটরদের কড়াকড়ি, দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার

অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন, শিক্ষার্থী-ভিজিটরদের কড়াকড়ি, দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার

ছবি: ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক

মোহাম্মাদ আবদুল মতিন
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে ফেডারেল সরকার। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য আনা, এক ভিসা থেকে আরেক ভিসায় পরিবর্তন করে অবস্থান দীর্ঘায়িত করা, ভিজিটর ভিসায় থেকে নতুন ভিসার আবেদন এবং ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে নতুন বিধিনিষেধ আসছে।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এসব পরিবর্তন ঘোষণা করেন। সরকারের লক্ষ্য, চলতি অর্থবছরে নিট বৈদেশিক অভিবাসন ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা।

নতুন নিয়মে ভবিষ্যতে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গী বা সন্তানকে শিক্ষার্থী ভিসার আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় আনতে পারবেন না। তবে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা পরিবারগুলোকে আলাদা করা হবে না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও আসিয়ানভুক্ত দেশের নাগরিক এবং পিএইচডিসহ কিছু নির্দিষ্ট উচ্চশিক্ষা কর্মসূচির শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম থাকবে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। নতুন ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সংশ্লিষ্ট কোর্স ও ভিসা শ্রেণির শর্ত আগে থেকেই যাচাই করতে হবে।

গত অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭টি শিক্ষার্থী ভিসা অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৯৯১টি ছিল পরিবারের সদস্যদের জন্য। এক কোর্স শেষ করে একই বা নিচের স্তরের আরেকটি কোর্সে ভর্তি হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত করা হবে।

নতুন নিয়মে কোর্স পরিবর্তন করতে চাইলে নতুন ভিসার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীকে আগের চেয়ে উচ্চতর যোগ্যতার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেমন, স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।

সরকারের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থী ভিসাকে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসনের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ কমানো। নতুন অভিবাসন নীতির পেছনে অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের আজ প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে নিট বৈদেশিক অভিবাসন ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০ জন। আগের ১২ মাসের তুলনায় এটি ১৭ হাজার ৪০০ জন বা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কম। একই সময়ে দেশটির মোট জনসংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৭০০ জন।

তবে এই নিট অভিবাসন সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং ২০২৭-২৮ সালের ২ লাখ ২৫ হাজার লক্ষ্যের চেয়ে বেশি। ভিজিটর ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় এসে পরে অন্য ভিসায় পরিবর্তনের সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সাধারণভাবে ভিজিটর ভিসায় ‘নো ফার্দার স্টে’ শর্ত যুক্ত করা হবে। এর ফলে ভিজিটর হিসেবে এসে অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে অন্য ভিসার আবেদন করে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমবে।

ওয়ার্কিং হলিডে মেকার কর্মসূচির দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার আসন রাখা হবে। গত বছর প্রায় ৫৭ হাজার ব্যাকপ্যাকার দ্বিতীয় বছর থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন।

তৃতীয় মেয়াদের সংখ্যা আরও কমিয়ে ৫ হাজারে নামানো হবে। গত বছর এই পর্যায়ে ছিলেন প্রায় ৩১ হাজার। নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত সংখ্যার মধ্যে ব্যালটের মাধ্যমে আবেদনকারী নির্বাচন করা হবে।

দ্বিতীয় বছর থাকার জন্য আঞ্চলিক এলাকায় ৮৮ দিনের কাজ এবং তৃতীয় বছরের জন্য ছয় মাসের আঞ্চলিক কাজ করতে হবে। তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য ও জলজ চাষসহ শ্রমিক সংকট রয়েছে এমন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দক্ষ ভিসা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে।

বিশেষ করে নির্মাণ খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশসহ দক্ষ কর্মী পাঠানো দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পয়েন্ট ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্যতার পাশাপাশি গৃহনির্মাণ-সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষতাকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বৈধ ভিসা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এজন্য সরকার ১০০ জন অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ এবং ২৫০টি নতুন আটক শয্যা যুক্ত করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা দেশ ছাড়বেন না, তাদের শনাক্ত, আটক ও ফেরত পাঠানোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

ভিসা আবেদনকারীদের অমূলক বা গ্রহণযোগ্যতার সম্ভাবনা নেই এমন আবেদন করতে উৎসাহিত করলে অভিবাসন এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য, ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার কমিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় কে আসবেন, কতদিন থাকবেন এবং বৈধ ভিসা না থাকলে কখন দেশ ছাড়বেন, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা।

সরকার জানিয়েছে, নতুন পরিবর্তনের বড় অংশ বিদ্যমান ক্ষমতার আওতায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে শিক্ষার্থী ভিসায় আগমন নিয়ন্ত্রণসহ আরও কিছু পরিবর্তনের জন্য পার্লামেন্টে নতুন আইন প্রয়োজন হবে।

লেখক- মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন, সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক।

 

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

পপুলার পোস্ট

নতুন কমেন্টস