প্রতিবেদন: বেলাল হোসেন ঢালী
বিদেশ বাংলা | সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রথমেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে বিএনপির দীর্ঘ পথচলা আরও শক্তিশালী ও সফল হোক। দেশ ও জনগণের কল্যাণে বিএনপির নেতৃত্বে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, এই প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল একটি পরিচিত ও পরীক্ষিত নাম। রাজপথের আন্দোলন, বিরোধী দলের কঠিন সময় এবং দলের পক্ষে জনমত গঠনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা বহুদিনের। কিন্তু ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও আলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দলের দীর্ঘদিনের এই পরীক্ষিত নেতাকে কি তাঁর যোগ্যতা ও রাজনৈতিক অবদানের তুলনায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে?
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ভাই বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির বিরোধী রাজনীতির কঠিন সময়ে তাঁকে নিয়মিতভাবে মাঠের কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য তুলে ধরতে দেখা গেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি দলের প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দলের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন এবং ৩১ দফা ও বিএনপির নির্বাচনী কর্মসূচি নিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন।
তবে নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে মন্ত্রিসভায় তাঁর নাম না থাকায় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে জুন মাসে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে আলাল ভাইয়ের নাম সম্ভাব্য মন্ত্রী হিসেবে উঠে এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হলো না কেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
‘পদ’ নয়, ‘মূল্যায়ন’
আলাল ভাইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, দলের জন্য দীর্ঘদিন মাঠে থাকা একজন প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতার রাজনৈতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগানো হচ্ছে?
বর্তমানে তাঁকে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অর্থাৎ তিনি একেবারে দায়িত্বহীন অবস্থায় নেই।
কিন্তু একজন উপদেষ্টার দায়িত্ব আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী দায়িত্ব এক নয়। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকলে একজন নেতা সরাসরি নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের কাছে সরকারের কর্মদক্ষতার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন।
সেখানেই আলাল ভাইকে ঘিরে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোদ্ধাদের মধ্যে যাঁদের মাঠের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে, তাঁদের কি সরকার পরিচালনার মূল কাঠামোয় পর্যাপ্ত জায়গা দেওয়া হচ্ছে?
নির্বাচন ও মনোনয়ন
আলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বরিশালের একটি আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত দল তাঁকে অন্য একটি আসনে মনোনয়ন দিলেও তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেননি। সে সময় তিনি বলেছিলেন, তিনি যে আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন, সেখানে দল কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
যদিও তিনি তখন দলের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে বড় কোনো সংকট হিসেবে দেখাননি এবং নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তবুও ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও দলের সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে। বিষয়টি আজও অনেকের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
দলের প্রতি অবস্থান অটুট
আলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও তিনি কখনো বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। নির্বাচনের আগে তিনি দলের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা চালিয়েছেন। নির্বাচনের পরও তিনি সরকারের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়েও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে সরকারের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার তুলনায় তাঁর দায়িত্বের পরিধি প্রত্যাশিত মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালে আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। দলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা।
একদিকে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সরকার পরিচালনায় সুযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের অভিজ্ঞতাকেও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। আলাল ভাইয়ের মতো নেতারা দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে দলের সঙ্গে আছেন। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা যদি কেবল বক্তব্য দেওয়া বা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সরকার পরিচালনায় সেই অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠবে।
একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন দলের কঠিন সময়ে যাঁরা মাঠে ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলের অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে না।
শেষ কথা
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ভাইকে বিএনপি কোনো দায়িত্ব দেয়নি, এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তিনি বর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবে সক্রিয় এবং জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্যও দিচ্ছেন।
তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, দলের জন্য ভূমিকা, রাজপথের সংগ্রাম এবং মাঠের অভিজ্ঞতার বিবেচনায় তাঁকে আরও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বা দলীয় দায়িত্বে দেখা যাবে কি না, সেটি অবশ্যই একটি যৌক্তিক রাজনৈতিক প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু আলাল ভাইয়ের ব্যক্তিগত পদ-পদবির প্রশ্ন নয়। এটি বিএনপির নেতৃত্বের কাছে একটি বৃহত্তর প্রশ্নও তুলে ধরে:
যাঁরা দীর্ঘদিন দলের কঠিন সময়ে পাশে ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং দলের জন্য নিজেদের সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন, ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে সরকার পরিচালনায় কতটা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ভাইয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বিএনপির নেতৃত্বের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং অভিজ্ঞ নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টিও অনেকাংশে স্পষ্ট করতে পারে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা, খুব শিগগিরই আমরা প্রিয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ভাইকে দলের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক কোনো দায়িত্বে দেখতে পাব। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও দলের প্রতি নিষ্ঠার যথাযথ মূল্যায়ন হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
শুভ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
লেখক: বেলাল হোসেন ঢালী, সিডনি প্রবাসী শিক্ষা উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও লেখক।

