সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | Monday, September 7, 2026
Homeঅস্ট্রেলিয়াউন্নয়নের গল্প আর বাস্তবতার আয়না

উন্নয়নের গল্প আর বাস্তবতার আয়না

বেলাল হোসেন ঢালী

একদিকে উন্নয়নের ঝলমলে বাংলাদেশ, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য সামান্য জায়গাটুকুও না পাওয়া মানুষের আর্তনাদ। একই শহরে পাশাপাশি থাকা এই দুই বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।

দীর্ঘ ত্রিশ বছর প্রবাসে থাকলেও প্রায় প্রতিবছরই দেশে যাওয়া হয়। কিন্তু এবার দেশে গিয়ে এমন দুটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম, যা আমার এত বছরের প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতার একেবারেই বাইরে।

এতদিন দূরদেশে বসে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা নানা গল্প শুনেছি। উন্নয়নের গল্প, অগ্রগতির গল্প, বদলে যাওয়ার গল্প। আমিও হয়তো অনেকটা বিশ্বাস করেই নিয়েছিলাম, যা কিছু বলা হয়, তার কিছু না কিছু তো বাস্তবেই ঘটছে।

উন্নয়নের ঝলক

দেশে গিয়ে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ল, তা হলো দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন। রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, সবকিছু দেখলে সত্যিই মনে হয়, বাংলাদেশ বদলে গেছে। গত কয়েক দশকে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যে হয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু এর চেয়েও বিস্ময়কর একটি অভিজ্ঞতা হলো ঢাকা বোট ক্লাবে গিয়ে।

আমার ব্রাদার-ইন-ল, যুগ্ম সচিব খাইরুল হাসানের আমন্ত্রণে একটি অনুষ্ঠানে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। গিয়ে যেন বাংলাদেশের আরেকটি চেহারা দেখলাম, যে চেহারা প্রবাসে বসে কল্পনা করাও কঠিন।

অভিজাত শ্রেণির মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, চালচলন, খাওয়া-দাওয়া, জীবনযাপন এবং দামি গাড়ির বহর দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি। অর্থ ব্যয়ের যে অবলীলতা সেখানে দেখলাম, তা আমাকে ভাবিয়েছে। মানুষের হাতে বিপুল অর্থ না থাকলে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা সম্ভব কীভাবে?

নিশ্চয়ই বাংলাদেশে এমন অনেক মানুষের সৃষ্টি হয়েছে, যাদের হাতে বিপুল অর্থ এসেছে। দেশের অর্থনীতি, মানুষের আয় এবং জীবনযাত্রার একটি অংশ যে অনেক বদলেছে, তার বাস্তব চিত্র যেন সেখানে চোখের সামনে দেখতে পেলাম।

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা তো দূরের কথা, অনেক ধনী অস্ট্রেলিয়ানও হয়তো এমন আড়ম্বর দেখে বিস্মিত হবেন।

কিন্তু এই অভিজ্ঞতার মাত্র কয়েকদিন পরই এমন একটি জায়গায় গেলাম, যেখানে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র দেখে শুধু অবাক হইনি, গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছি।

ঢাকা মেডিকেলের করিডোরে অন্য এক বাংলাদেশ

ঢাকা মেডিকেল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমার মনে হলো, আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র ও অবহেলিত কোনো দেশের একটি হাসপাতালে দাঁড়িয়ে আছি।

হাসপাতালের করিডোর, বারান্দা, সিঁড়ির আশপাশ, এমনকি বাথরুমের কাছেও রোগী। কেউ শুয়ে আছেন, কেউ বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। হাসপাতালের বেডের নিচে, পাশে কিংবা যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই মানুষ চিকিৎসার আশায় পড়ে আছেন।

কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত, কেউ যক্ষ্মায়, কেউ গর্ভবতী, কেউ অন্য কোনো জটিল রোগে ভুগছেন। নানা বয়সের নানা রোগী একই জায়গায় ঠাসাঠাসি করে চিকিৎসার অপেক্ষায় আছেন।

কারও মাথার কাছে আরেকজনের পা, কেউ অন্যের গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে শুয়ে আছেন। অসুস্থ মানুষগুলো শুধু চিকিৎসার সংকটেই নয়, জায়গার অভাবেও চরম কষ্ট পাচ্ছেন।

আমার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের সহযোগী অধ্যাপক ও আমার আরেক ব্রাদার-ইন-ল, চিকিৎসক রুবায়েত। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, “এটা কী? ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে ছাত্রজীবনে আমরা বরিশালের লঞ্চের ডেকে বসে যেতাম। সেখানকার পরিবেশও তো এর চেয়ে ভালো ছিল! এটা তো একটি হাসপাতাল, তাও আবার ঢাকা মেডিকেলের মতো দেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র।”

চিকিৎসক রুবায়েত শান্তভাবে বললেন, “এর চেয়েও করুণ অবস্থা পুরোনো ভবনে। গেলে দেখতে পাবেন।”

আমি আর যেতে চাইনি।

মনে মনে ভাবলাম, কোনো সুস্থ মানুষ এখানে এক ঘণ্টা থাকলে হয়তো সুস্থভাবে বের হতে পারবেন না। মানুষ হাসপাতালে আসে সুস্থ হওয়ার জন্য, জীবন বাঁচানোর জন্য। অথচ এখানে হাসপাতালের পরিবেশই যেন রোগীর জন্য আরেকটি অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এ দৃশ্য যেন কারও কাছে আর নতুন নয়। এটাই যেন বাস্তবতা। অথচ কারও মুখে কোনো প্রতিবাদ নেই।

তাহলে উন্নয়নটা কার জন্য?

যে দেশে বছরের পর বছর উন্নয়নের গল্প বলা হয়েছে, যে দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, সেই দেশের সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালের বেডটুকুও কেন পাবেন না?

একদিকে শহরের ঝলমলে জীবন, দামি গাড়ির বহর, বিলাসবহুল আয়োজন এবং বিপুল অর্থের প্রদর্শন। অন্যদিকে একই শহরের একটি হাসপাতালে একজন অসুস্থ মানুষ মেঝেতে, করিডোরে কিংবা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসার অপেক্ষায় কাতরাচ্ছেন।

এই দুই বাংলাদেশকে পাশাপাশি দাঁড় করালে প্রশ্ন জাগে, আমরা আসলে কোন বাংলাদেশকে উন্নত বলছি?

উন্নয়ন শুধু মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, সেতু কিংবা প্রশস্ত রাস্তার নাম নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে সম্মানের সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা পান।

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষ যদি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের মেঝেতে জায়গা না পান, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় সংখ্যাগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা অর্থ বহন করে?

বর্তমান সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ

আমরা জানি, বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়। এর জন্য বিপুল অর্থ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নীতির প্রয়োজন।

কিন্তু ঢাকা মেডিকেলের মতো অন্তত আরও কয়েকটি আধুনিক ও বৃহৎ হাসপাতাল কি তৈরি করা যায় না?

রাষ্ট্র যদি বড় বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারে, তাহলে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ ও চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণেও কেন একই ধরনের অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না?

একটি হাসপাতাল কেবল একটি ভবন নয়। একটি হাসপাতাল মানে একজন মায়ের জীবন, একজন বাবার আশা, একজন সন্তানের ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন রক্ষার অবকাঠামোকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে চাই না। একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে দেশে গিয়ে নিজের চোখে দেখা বাস্তবতার কথাই বললাম।

উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন দেশের মানুষের জীবনও সেই উন্নয়নের সুফল পায়।

লেখক: বেলাল হোসেন ঢালী, সিডনিপ্রবাসী শিক্ষা উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও লেখক।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_img

পপুলার পোস্ট

নতুন কমেন্টস