সিডনিতে দীর্ঘ এক যুগ পর কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার পরিবেশনা যেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক অনন্য সাংস্কৃতিক পুনর্মিলনের উপলক্ষ হয়ে উঠল। শনিবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় নরওয়েস্ট কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ নাইট ২০২৬’ ছিল সংগীত, আবেগ, নস্টালজিয়া এবং বাঙালিয়ানার এক বর্ণিল মিলনমেলা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত থেকে দর্শকদের স্বাগত জানান কাউন্সিলর ইব্রাহিম খলিল মাসুদ, আলম তপন, নুসরাত তানজিলা, মোহাম্মাদ আবিদ শামীম ও সাকিনা আক্তার। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ জামান টিটু। এ সময় তিনি বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আয়োজকদের এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শুরু থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে ভরে ওঠে পুরো মিলনায়তন। সিডনির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেন। দর্শকদের উচ্ছ্বাস, করতালি, সম্মিলিত কণ্ঠে গান গাওয়া এবং শিল্পীদের প্রতি ভালোবাসা পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে এক অসাধারণ আবহ তৈরি করে। দর্শকাসনের প্রতিটি সারি ছিল প্রায় পূর্ণ, যা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসারই প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা, যিনি সম্প্রতি তাঁর সংগীতজীবনের ৬০ বছর পূর্ণ করেছেন। সাতজন দক্ষ যন্ত্রশিল্পী নিয়ে তিনি সিডনির মঞ্চে পরিবেশন করেন তাঁর কালজয়ী জনপ্রিয় গানগুলো। প্রতিটি পরিবেশনার পর দর্শকদের দীর্ঘ করতালি ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।
রুনা লায়লার সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন বেঙ্গল সিম্ফনি, যা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সুরে তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোকে নতুন মাত্রা দেয়। পাশাপাশি কোক স্টুডিও বাংলা-খ্যাত শিল্পী ইমন চৌধুরী, আলেয়া বেগম, পিন্টু ঘোষ, মিথুন চক্র ও মৃধা শিবলু মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা উপহার দেন। বিশেষ উপস্থিতি ছিলেন নাজনীন নেহা।
অনুষ্ঠানজুড়ে দর্শকদের আবেগ ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু পরিবার সন্তানদের নিয়ে অংশ নেন, যাতে নতুন প্রজন্মও বাংলাদেশের সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। প্রবীণদের স্মৃতিচারণ, তরুণদের উচ্ছ্বাস এবং শিশুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনে রূপ নেয়।
অনেক দর্শকের ভাষায়, এটি শুধু একটি কনসার্ট ছিল না, বরং প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য ছিল নিজের শেকড়, স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হওয়ার এক আবেগঘন সন্ধ্যা। রাজনৈতিক মতভেদ, সামাজিক বিভাজন কিংবা ব্যস্ত প্রবাসজীবনের ক্লান্তি ভুলে সবাই একই ছাদের নিচে একসঙ্গে গেয়েছেন প্রিয় শিল্পীর গান।
রুনা লায়লার সিডনি সফরকে ঘিরে প্রবাসীদের আগ্রহের কারণও ছিল বিশেষ। এর আগে তিনি ২০০৭ সালে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভেন্যু সিডনি অপেরা হাউসে একক সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করেন। পরে ২০১৪ সালে ‘প্রবাস পরবনী বেঙ্গল সাংস্কৃতিক উৎসব’-এ অংশ নেন। দীর্ঘ বিরতির পর এবার তাঁর প্রত্যাবর্তন প্রবাসী সংগীতপ্রেমীদের জন্য ছিল বহুল প্রতীক্ষিত।
অনুষ্ঠান শেষে আয়োজকরা উপস্থিত দর্শকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, সিডনিবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস এবং সহযোগিতাই ‘বাংলাদেশ নাইট ২০২৬’-কে একটি স্মরণীয় সাফল্যে পরিণত করেছে। তাদের ভাষায়, এটি ছিল “আপনাদের অনুষ্ঠান, আপনাদের রাত”, যা প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত করেছে।
সিডনিতে সফল এই আয়োজনের পর আগামী ৮ আগস্ট মেলবোর্ন রিসাইটাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে ‘রুনা লায়লা অ্যান্ড বেঙ্গল সিম্ফনি লিগ্যাসি ট্যুর’-এর পরবর্তী কনসার্ট। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সেখানেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের একই রকম উচ্ছ্বসিত সাড়া মিলবে।
ছবি: সুহৃদ সোহান হক, টিম প্রেস অস্ট্রেলিয়া এবং আয়োজক কমিটি
তথ্যসূত্র: টিম প্রেস অস্ট্রেলিয়া (বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান জার্নালিস্ট গ্রুপ)।




