মোহাম্মাদ আবদুল মতিন
বিদেশ বাংলা | সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক মুসলিম সমাজের সুপরিচিত ইসলামী দাঈ, তাবলিগ জামাতের প্রবীণ মুরুব্বি ও মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এবিএম শাহাবুদ্দীন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত ২২ জুলাই সিডনির লাকেম্বায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং সম্প্রতি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শাহাবুদ্দীন ১৯৯১ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইসলামী দাওয়াহ, মানবকল্যাণ, নৈতিক শিক্ষা ও কমিউনিটি উন্নয়নে নীরবে কাজ করে গেছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে কর্মজীবনের সাফল্যের পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিবেদিত করেন ইসলামের দাওয়াহ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজসেবার কাজে। তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন, বিনয়ী আচরণ ও আন্তরিকতা তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।


সিডনির লাকেম্বাকে কেন্দ্র করে তাঁর দাওয়াহ কার্যক্রম ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি আরব, পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, তুর্কি ও সোমালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানদের মধ্যেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সম্মানিত। ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ, তরুণ প্রজন্মের নৈতিক বিকাশ, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও তিনি নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিতেন। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও আস্থার প্রতীক।
২৩ জুলাই সিডনির অবার্নে অবস্থিত ওমর মসজিদে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সিডনিসহ ক্যানবেরা, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড ও ডারউইন থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি, আলেম, কমিউনিটি নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁকে রুকউড জেনারেল কবরস্থানের মুসলিম সেকশনে দাফন করা হয়। উপস্থিত অনেকেই বলেন, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থ সেবার স্বীকৃতিই ছিল এই অভূতপূর্ব উপস্থিতি।
ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আল্লাহর স্মরণে ছিলেন এবং ইসলামের দাওয়াহর কাজ নিয়ে চিন্তা করতেন। তাঁর মৃত্যুতে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামী ও সামাজিক সংগঠন, আলেম, কমিউনিটি নেতা এবং সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ তাঁর স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিনয় ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছিলেন।
কমিউনিটি নেতাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামী দাওয়াহ, বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং মুসলিম সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবিএম শাহাবুদ্দীনের অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর জীবন ও কর্ম শুধু অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজ নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও এক মূল্যবান উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।

